যুদ্ধে যেতে চান দুই কোটি ৯২ লাখ ইরানি

মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেতে ইচ্ছুক তরুণদের একটি কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন ৭৫ বছর বয়সী এক নারী। ইরানের বন্দর আব্বাসের ওই কেন্দ্রে নিজের নাম লেখাতেন চান তিনি।

নিবন্ধন কেন্দ্রের এক স্বেচ্ছাসেবক বৃদ্ধার জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে ভালোভাবে দেখলেন। তারপর বললেন: ‘মা, আপনার বয়স ৭৫।
এই বয়সে কেউ যুদ্ধে যেতে পারেন না।’
বৃদ্ধা একটুও থামলেন না।
জবাব দিলেন, ‘যোদ্ধাদের তালিকায় আমার নাম থাকলে ইসরায়েল ধ্বংস হয়ে যাবে।’ 

১৯৫১ সালের ১২ আগস্ট জন্মগ্রহণকারী ওই নারী এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন যেন বয়স তার জন্য কোনো বাধাই নয়।

এই সংক্ষিপ্ত সংলাপটি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ইরানি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং প্রতিরোধের এক প্রতীকী মুখ। 

জান ফিদা ফর ইরান: গণ-অংশগ্রহণের এক নজির
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ‘জান ফিদা’ (জীবন-উৎসর্গ) কর্মসূচি শত্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে অংশ নিতে আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবকদের নিবন্ধনের জন্য চালু করা হয়েছে দুই সপ্তাহ আগে।

এই কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ২ কোটি ৯২ লাখেরও বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ নতুন করে এতে যুক্ত হচ্ছেন বলে দাবি করা হয়েছে। শুরুর দিকেই বিপুল সাড়ার কারণে সাইটটি একাধিকবার প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়ে।

ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা আরও বিস্ময়কর সীমা ছাড়িয়ে যাবে। এর মাধ্যমে শত্রুরা উপলব্ধি করবে যে, অস্তিত্বগত হুমকির মুখে পড়লে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে কথা বলে।

নেতৃত্ব থেকে সাধারণ মানুষ—একই সারিতে
এই কর্মসূচির প্রতীকী গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়, যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এতে নাম নিবন্ধন করেন। যুদ্ধে অংশ নিতে নাম লেখানোর পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান এক বক্তব্যে বলেন, ‘গর্বিত ইরানিরা জীবন উৎসর্গ করতে নিবন্ধন করেছেন। আমিও আমার জীবন ইরানের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলাম, আছি এবং থাকব।’

ইরানি গণমাধ্যমে এটিকে জনগণের সঙ্গে নেতৃত্বের সংহতির বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই একই লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ।

নিবন্ধনের প্রবণতা বাড়ার কারণ
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার রাজনৈতিক প্রতিবেদকের বরাতে জানা গেছে, তথাকথিত তৃতীয় আরোপিত যুদ্ধের সাময়িক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রতিরক্ষা প্রচারণায় নিবন্ধনের হার ক্রমাগত বাড়ছে।

বিশেষ করে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির এক বার্তার পর থেকে এই প্রবণতা আরও দ্রুত হয়েছে। শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির শাহাদাতের চল্লিশতম দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ওই বার্তায় জনগণের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

বার্তার একাংশে বলা হয়: ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে যেন কেউ মনে না করে যে রাস্তায় উপস্থিতি আর প্রয়োজন নেই। বরং যদি সাময়িকভাবে সামরিক সংঘর্ষে নীরবতার সময়ও আসে, তাহলে ময়দান, মহল্লা ও মসজিদে উপস্থিত থাকার দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। আপনাদের কণ্ঠস্বর আলোচনার ফলাফলে প্রভাব ফেলে; যেমন ‘জানফিদা ফর ইরান’ প্রচারণার ক্রমবর্ধমান বিস্ময়কর অংশগ্রহণও এ ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী উপাদান।’

তিনি আরও বলেন, এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণের ফলে ইরান জাতির সামনে একটি গৌরবময়, উজ্জ্বল এবং সম্মান-সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

এই প্রচারণাকে ইরানি গণমাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বহিরাগত হুমকি মোকাবিলায় জনগণের প্রস্তুতি এবং একই সঙ্গে একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের আশাও প্রতিফলিত করছে।

রাজনৈতিক বার্তা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, ‘জান ফিদা’ কেবল একটি নিবন্ধন কর্মসূচি নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক বার্তা বহন করছে। এটি সম্ভাব্য সংঘাতের মুখে জনগণের প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরে, শত্রুপক্ষের জন্য এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে এবং অভ্যন্তরীণভাবে জাতীয় ঐক্যকে দৃশ্যমান করে।

যুদ্ধবিরতির মাঝেও রাজপথে ইরানিরা
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই ইরানের বিভিন্ন শহরে মানুষ রাজপথে নেমে আসে। তারা একদিকে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে, অন্যদিকে জাতীয় সংহতির বার্তা দিয়েছে। এমনকি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির পরও এই উপস্থিতি থেমে যায়নি। গতরাতেও তেহরানের ইনকিলাব চত্বরে হাজার হাজার মানুষ ইরানে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানান। সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ‘ইসলামি বিপ্লবের নতুন নেতার’ প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার পাশাপাশি দেশ রক্ষার শপথও নেন।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ