বাংলাদেশ ব্যাংক-বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় নিয়োগের সমালোচনায় রুমিন ফারহানা

বাংলাদেশ ব্যাংক ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় নিয়োগ দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানা।

মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত রুমিন ফারহানা তাঁকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় বিএনপিকে ধন্যবাদ জানান।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

২০১৮ সালের একাদশ সংসদে বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি নির্বাচিত হলেও এবার তিনি ছিলেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জয়ী হন। নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পাওয়ার প্রসঙ্গে তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, এ কারণে তিনি দেশের লক্ষ মানুষের ভালোবাসা বুঝতে সক্ষম হয়েছেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রিন্সটন বা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রিধারী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং সোয়েটার ফ্যাক্টরির এমডি। একই ধরণের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। এসব জায়গায় দলীয় ভিসি ও প্রো-ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দল করাটা দোষের না হলেও দল না করলে যদি নিয়োগ দেওয়া না হয়-সেটা দুর্ভাগ্যজনক।

রুমিন ফারহানা বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য বারবার আলোচনা হয়েছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে চব্বিশের অভ্যুত্থানের আগে-পরে সব সময় বলা হয়েছে যে, ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা। বিএনপি তার ভিশন-২০৩০ ও ৩১ দফায় এ সম্পর্কিত প্রস্তাব রেখেছে। এসব কারণে এবার রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদিত ভাষণের বাইরে গিয়ে নিজের মতো করে ভাষণ দিতে পারবেন-এমন প্রত্যাশ্যা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল এবারও মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদিত ভাষণ দিতে হয়েছে রাষ্ট্রপতিকে। এতটুকু স্বাধীনতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া যায়নি-তাহলে কোন ভারসাম্যের কথা আমরা বলছি।

তিনি বলেন, হাজার মানুষের আত্মত্যাগ হচ্ছে এই সংসদ। এই মানুষগুলো কারা যাদের আত্মত্যাগে আজ আমরা কেউ এমপি, কেউ মন্ত্রী, কেউ বিরোধী দল হয়ে সংসদে এসেছি। তাদের স্বপ্ন কী ছিল? তারা জানতো তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে তারা কেউ এমপি-মন্ত্রী হবেন না। তারা ছিলেন দেশের খেটে খাওয়া একেবারেই সাধারণ জনগণ। তারা নতুন বাংলাদেশ তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। নতুন রাজনীতি নির্মাণ ও নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। গত কয়েক বছরের বৈষম্য থেকে মুক্ত হয়ে সকলকে নিয়ে একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

বিএনপির সাবেক এই নেত্রী বলেন, যে প্রত্যাশা নিয়ে গণঅভ্যুত্থাণ-তাদের প্রত্যাশা কিন্তু বায়বীয় বা অলিক ছিল না। এখনও দেয়ালে দেয়ালে তাকালে দেখা যাবে তারা তাদের স্বপ্নের কথা লিখে গেছেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ কিংবা ‘দেশটা কারো বাপের না’। ‘তুমি কে-আমি কে? বিকল্প বিকল্প’, ‘আসছে ফাগুন, আমরা হবো দ্বিগুণ’, ‘শোনো মহাজন, আমরা অনেকজন’, ‘দিনে নাটক, রাতে আটক’, ‘নাটক কম করো পিও’, হামাক ব্যাটা মারলো কেন? এমন হাজার প্রশ্ন, লাখ-লাখ জিজ্ঞাসা। এই লড়াইটা কেবল একটা সরকার পরিবর্তনের লড়াই ছিল না। সকলকে নিয়ে সবার বাংলাদেশ গঠন করার স্বপ্ন নিয়ে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম-ধর্ম-বর্ণ-জাতিগোষ্ঠী বা লৈঙ্গিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘আদারস’ করে দেওয়া হবে না।

জুলাই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন নারীরা। নতুন প্রজন্মের একঝাঁক তরুণ মুখ পাওয়া গিয়েছিল। এক বছর পার না হতেই সেই নারীরা হারিয়ে গেল কেন?

এবারের সংসদে সরাসরি ৭ নারী এমপি নির্বাচিত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি এই প্রশ্ন তুলে বলেন, মিছিলের সামনের সারিতে নারীর প্রয়োজন হয়। টিয়ার সেল ও লঠিচার্জের সামনে নারী ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। অস্থির সময়ে নারীর সাহায্য ছাড়া পার হওয়া যায় না। আর সব কিছু যখন ঠিক হয়, তখন নারী হয়ে যায় ‘ট্রলের বস্তু’। নারীর পোশাক, নারীর চেহারা, নারীর কথা, নারীর হাসি-সব কিছু তখন হাসির খোরাকে পরিণত হয়। বায়ান্ন শতাংশ মানুষকে পেছনে ফেলে নতুন বাংলাদেশ রচনার কোনো চিন্তা যদি কেউ করে থাকে- সেটা কখনো সম্ভব নয়। কোনদিন সম্ভব নয়।

রুমিন বলেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে যে বিপুল পরিমান টাকা পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে এর পরিমাণ ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। তা ফেরত আনা না গেলে কিংবা ব্যাংক খাতে থাকা ৬ লাখ কোটির টাকার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা না গেলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসবে না। মিথ্যা ইনভয়েসিং বন্ধ করা না গেলে টাকা পাচার বন্ধ হবে না।

রুমিন ফারহানা বলেন, রাষ্ট্রপতির ভাষণে অলিগার্কিক কাঠামো ভেঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ও বিনিয়োগ নির্ভর অর্থনীতি তৈরি করা। আশা করবো- আগামীতে সালমানের জায়গায় সাইফুর এসে বসবে না।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ