‘নিজের পোলারা খারাপ গালি দিছে, জুতা দিয়াও মারছে’

‘আমি গেরামে সবতে বেশি পরিশ্রম করতাম। পরিশ্রম কইরা বাড়ি বানাইলাম, জমি কিনলাম। এইসব কার লাইগা করলাম! অহন আমিই বাড়িত থাকতাম পারি না। জায়গা জমি লেইখা দেওনের লাইগা নিজের পোলারা অনেক খারাপ খারাপ গালি দিছে, মাইর খাইছি। জুতা দিয়াও মারছে। শেষে মাইরা বাড়ি থাইকা বাইর কইরা দিছে।’ কথাগুলো বৃদ্ধ আব্দুল কাদিরের (৮০)। ছেলেরা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার কিশোরগঞ্জের এই কৃষক এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রিত।

আব্দুল কাদির সদর উপজেলার কর্শকড়িয়াইল ইউনিয়নের চিকনিরচর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি স্ত্রী জুমেলা খাতুনকে (৭২) নিয়ে জেলা শহরের মনিপুরঘাট এলাকায় অন্যের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। ছোট মেয়ে সখিনা আক্তার (৩০) দর্জির কাজ করে তাদের খরচ চালাচ্ছেন।

বুধবার মনিপুরঘাট এলাকায় কথা হয় আব্দুল কাদির ও তাঁর স্ত্রী জুমেলা খাতুনের সঙ্গে। এ দম্পতির চার ছেলে ও চার মেয়ে। তিন ছেলে তাজুল ইসলাম (৫৩), জালাল মিয়া (৪৮) ও নূর মোহাম্মদ (৪১) জমি লিখে দিতে বাবাকে চাপ দিয়ে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় মারধরও করেছেন। চর-থাপ্পড়, এমনকি জুতা দিয়েও পিটিয়েছেন।

বৃদ্ধ এই দম্পতির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ১১ মে সকালে ছুরি, রড ও লাঠি নিয়ে জমি লিখে দেওয়ার জন্য তিন ছেলে আব্দুল কাদিরকে হুমকি দেন। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তারা একযোগে মারধর শুরু করেন। এ সময় মেয়ে সুফিয়া আক্তার (৫১) বাবাকে রক্ষা করতে গেলে তাঁর মাথায় ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। আব্দুল কাদিরের স্ত্রী জুমেলা খাতুন (৭২) ও অপর মেয়ে মাজেদা আক্তার (৩৩) এগিয়ে গেলে তাদেরও বাঁশের লাঠি ও রড দিয়ে পেটানো হয়। মারপিটে লতিফ (৪৬) ও ইয়াসিন (২২) নামে দুই প্রতিবেশীও অংশ নেন। তারা বসতঘর কুপিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। শোকেস থেকে ৮০ হাজার টাকাও নিয়ে গেছেন।

আহত মেয়ে সুফিয়াকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও ছেলেরা বাধা দেন। অবশেষে প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করাতে হয়েছে। এ ঘটনার ১৬ দিন পর ২০২৩ সালের ২৭ মে আব্দুল কাদির বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। আসামি করেছেন তিন ছেলে নূর মোহাম্মদ, তাজুল ইসলাম ও জালাল মিয়াসহ প্রতিবেশী লতিফ ও ইয়াছিনকে।

তাজুল ২৯ দিন, আর জালাল ১৫ দিন কারাবাসও করেছেন। তারা আপসের শর্তে জামিন পেলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আইনশৃংখলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার সুযোগে মা-বাবা ও ছোট বোন সখিনা আক্তারকে (৩০) পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তাঁরা এখন জেলা শহরের মনিপুরঘাট এলাকায় অন্যের আশ্রয়ে থাকেন। তিন ছেলে মিলে বাড়ি দখল নিয়ে আছেন।

প্রায় দুই বছর হতে চললেও এখন পর্যন্ত মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। এই দম্পতি বাড়িতেও যেতে পারছেন না। তাদের বাড়িসহ কৃষিজমিও ছেলেরা ভোগদখল করেছেন। মূল্যবান গাছপালা আর ঝাড়ের মূল্যবান বাঁশ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আব্দুল কাদিরের ছোট মেয়ে সখিনা আক্তার শহরে দর্জির কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন। অন্য মেয়েরাও কিছু সাহায্য করেন।

এরকম পরিস্থিতিতে সখিনার বিয়েও দিতে পারছেন না বলে জানালেন আব্দুল কাদির। তিনি আরও বলেন, তাঁর অপর ছেলে বিল্লাল মিয়া (৪৫) এসব বিবাদে না থাকলেও অন্য ভাইদের বাধাও দিতে পারেননি। ঘটনার কিছুদিন পর বিল্লাল সৌদি আরব চলে গেছেন। তার আলাদা সংসার আছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আব্দুল কাদিরের ছেলে ও মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদের মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি। কাঁদতে কাঁদতে মা জুমেলা খাতুন বললেন, ‘পোলাগুলিরে পেটে ধরলাম, বড় করলাম। জীবনে অনেক কষ্ট করছি। শেষ বয়সে হেই পোলারা মারতো! এমুন অপরাধই করলাম!’

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ