হাসিতে বদলে গেল ফাইজার জীবন

সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে প্রচুর ভিড়। সেখানে ধোঁয়া আর কোলাহলের মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকত আট বছরের ফাইজা। হাতে থাকত ফুলের ঝুড়ি। কেউ এগিয়ে এলেই হাসিমুখে বাড়িয়ে দিত ফুল। কেউ কিনতেন, দুটো টাকা আসত শিশুটির হাতে। প্রত্যাখ্যাতও হতে হয়েছে কতশতবার। তখন মলিন মুখে ফিরে এলেও পরক্ষণেই মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে যেত পরবর্তী সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে। এই ছিল ফাইজার প্রতিদিনের জীবনচিত্র।

ছোট্ট একটি ঘটনা ফাইজার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শিশুটির হাসিমাখা একটি ছবি পাল্টে দিয়েছে জীবন। ফেসবুকে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফাইজা পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘ভাইরাল ফুলকন্যা’ হিসেবে। তাকে নিয়ে ফেসবুক পোস্ট আবেগে ভাসিয়ে দেয় হাজারো মানুষকে। ব্যস্ততার ফাঁকে ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে থমকে যান অনেকে, তাদের চোখ আটকে যায় ছোট্ট হাসিমাখা মুখে। বিবেক যেন জেগে ওঠে। কেউ কেউ দত্তক নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছিলেন। শুক্রবার রাতে শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছেন সিলেট টাইটানসের সাবেক উপদেষ্টা ও ফাহিম আল চৌধুরী ট্রাস্টের কর্ণধার ফাহিম আল চৌধুরী। যুক্তরাজ্য প্রবাসী এই শিল্পপতি ফাইজার পড়াশোনার দায়িত্ব নেন। এ ছাড়া শিশুটির পাশে দাঁড়িয়েছেন আরও অনেক দায়িত্বশীল মানুষ।

নগরীর বাদামবাগিচার শেষ মাথায় থাকা বশর মিয়ার কলোনিতে নানি মমতাজ বেগমের সঙ্গেই থাকে ফাইজা আক্তার মাইশা। গতকাল শনিবার সেখানে যাওয়ার আগে খাশদবীর এলাকায় গিয়ে বাসার ঠিকানা জানতে চাইলে একাধিক লোক এগিয়ে আসেন। সিকি কিলোমিটার দূরের অনেক বাসিন্দাই এখন ফাইজাকে চেনেন। বাসার কাছাকাছি এক নারীকে বাসার কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘এটা কপাল, এটা কপাল। এইখানে থাকে আমাদের চাঁদকপালি ফাইজা।’ বলে বাসাটি দেখিয়ে দেন।

ছোট্ট ও অস্বাস্থ্যকর খুপরি ঘরটিই নানি মমতাজ বেগম ও ফাইজার আশ্রয়। মাথার ওপরে যে সিলিং ফ্যানটি ঘুরছিল, সেটি যে কারো মাথায় লেগে যেতে পারে। ঘরে ঢোকার পরপরই চিরচেনা হাসি দিয়ে ওঠে ফাইজা। তাকে আর নিজেদের পরিচয় দিতে হয়নি। নিজ থেকেই ফাইজা বলে ওঠে, ‘চিনছি, আফনারা সাংবাদিক।’ বয়স কম হলেও কথায় বেশ ঝরঝরে ফাইজা। তার পাশে বেশ কয়েকজন লোক। তারা এসেছেন শিশুটিকে একনজর দেখতে।

এ সময় বেশ কয়েকটি শপিংব্যাগ বের করে দেখাতে থাকে ফাইজা। সে জানায়, অনেকেই তার জন্য নতুন নতুন জামা উপহার দিয়েছেন। সে ও জেনেছে, তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন শিল্পপতি। এ সময় আর ফুল বিক্রি করবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে লাজুক হাসিতে সে জানায়, ফাহিম ভাই মনে কষ্ট পাবেন।
ফাইজার বড় বোন মাহিয়া আক্তার নগরীর গোয়ালাবাজারে খালার বাসায় থাকে। নানির অভাবের সংসারে সহায়তা করতেই সে ফুল বিক্রি করত। চার বছর ধরে নানিই তার সব।

নানি মমতাজ বেগম জানান, ফাইজার জন্মের আগেই তার বাবা দেলওয়ার হোসেন পরিবার ছেড়ে চলে যান। মা রোজিনা আক্তার কলি মারা গেছেন বছর চারেক আগে। সেই থেকে চার বছরের ফাইজা বেড়ে উঠছে তাঁর কাছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা ফাইজার মুখ থেকে কখনও হাসি কেড়ে নিতে পারেনি। সেই হাসিই বদলে দেয় সবকিছু।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ