যুক্তরাষ্ট্র ১-০ ইংল্যান্ড (১৯৫০)
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আলফ রামসে, টম ফিনির মতো তারকাদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ড দল সেবারই প্রথম বিশ্বকাপে অংশ নেয় এবং তারা ছিল অন্যতম ফেভারিট। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দলটিতে ছিল এক দিন একসঙ্গে অনুশীলন করা কিছু পার্ট-টাইম খেলোয়াড়, যাদের মধ্যে ছিলেন একজন থালাবাসন ধোয়ার কর্মী, একজন চিঠিপত্র বিলিকারী এবং একজন শিক্ষক।
পশ্চিম জার্মানি ৩-২ হাঙ্গেরি (১৯৫৪)
বর্তমান যুগে জার্মানির জয়কে অঘটন মনে না হলেও ১৯৫০-এর দশকে পুসকাসের হাঙ্গেরি দল ছিল অদম্য। ‘মাইটি ম্যাজিয়ার্স’ খ্যাত হাঙ্গেরি সেবার দক্ষিণ কোরিয়াকে ৯-০ এবং এই পশ্চিম জার্মানিকেই গ্রুপ পর্বে ৮-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে।
উত্তর কোরিয়া ১-০ ইতালি (১৯৬৬)
শীতল যুদ্ধের আবহে উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়দের ভিসা দেওয়া নিয়ে ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দ্বিধায় ছিল। মাঠের লড়াইয়ে ইতালির মিডফিল্ডার জাকোমো বুলগারেয়ি ইনজুরিতে পড়লে ইতালি ১০ জনের দলে পরিণত হয় (তখন খেলোয়াড় বদলির নিয়ম ছিল না)। এর সাত মিনিট পরই উত্তর কোরিয়ার পাক দু ইক গোল করে বসেন। দুই বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকে স্তব্ধ করে ম্যাচটি জিতে নেয় উত্তর কোরিয়া। এই ঐতিহাসিক গোলটির স্থানটি ধরে রাখতে স্টেডিয়ামটি ভেঙে ফেলার পরও লোহার স্টাড দিয়ে চিহ্নটি চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে।
আলজেরিয়া ২-১ পশ্চিম জার্মানি (১৯৮২)
তৎকালীন ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন এবং দুই বারের বিশ্বসেরা জার্মানি দলে ছিলেন লোথার ম্যাথাউস, রুমেনিগের মতো তারকারা। অন্যদিকে আলজেরিয়া দলে বড় কোনো নাম ছিল না। জার্মানির অতি-আত্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে ম্যাচের ৫৪ মিনিটে রাবাহ মাদজেরের গোলে এগিয়ে যায় আলজেরিয়া। রুমেনিগে গোল করে জার্মানিকে সমতায় থামালেও, তার পরপরই আলজেরিয়ার কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড লাখদার বেলৌমি গোল করে পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেন।
ক্যামেরুন ১-০ আর্জেন্টিনা (১৯৯০)
বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ছিল টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট। মিলানের সান সিরো স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে আসা ক্যামেরুন। ক্যামেরুনের শক্ত রক্ষণভাগের সামনে ম্যারাডোনার জাদু কাজ করেনি। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রাঁসোয়া ওমাম-বিয়িক এক ফ্রি-কিক থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ক্যামেরুনকে জয় এনে দেন।
ফ্রান্স ০-১ সেনেগাল (২০০২)
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ, সাবেক উপনিবেশ বনাম উপনিবেশের লড়াই এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিদায়ের গল্প সবকিছুরই সাক্ষী ছিল ২০০২ সালের এই ম্যাচ। ফরাসি আক্রমণভাগকে রুখে দেওয়ার নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল সেনেগালের। এল হাদজি দিউফের গতি এবং ম্যাচের ৩০ মিনিটে পাপা বুবা দিওপের গোলে সেনেগাল জয় ছিনিয়ে নেয়। ফ্রান্স সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় আর সেনেগাল দ্বিতীয় আফ্রিকান দেশ হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়।
জার্মানি ৭-১ ব্রাজিল (২০১৪)
ঘরের মাঠে ১৯৫০ সালের মারাকানা ট্র্যাজেডির ক্ষত ভুলে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখছিল ব্রাজিল। কিন্তু সেমিফাইনালে ইনজুরির কারণে নেইমার এবং কার্ড জটিলতায় অধিনায়ক থিয়াগো সিলভাকে ছাড়া মাঠে নামে তারা। ম্যাচের ১১ মিনিটেই জার্মানি গোল উৎসবের খাতা খোলে। ২৩ থেকে ২৯ মিনিটের মধ্যে মাত্র ৬ মিনিটে তারা আরও ৪টি গোল করে ব্রাজিলকে স্তব্ধ করে দেয়। দ্বিতীয়ার্ধে আরও দুটি গোল হজম করার পর শেষ মিনিটে একটি সান্ত্বনার গোল পায় ব্রাজিল। ৭-১ গোলের এই হার ছিল ১৯২০ সালের পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় পরাজয়, যা ব্রাজিলের জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে গণ্য হয়।
নেদারল্যান্ডস ৫-১ স্পেন (২০১৪)
২০১০ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট ২০১৪ সালের গ্রুপ পর্বের শুরুতেই মুখোমুখি হয়। তৎকালীন বিশ্ব ও ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের হয়ে জাবি আলোনসো ২৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। কিন্তু প্রথমার্ধ শেষের ঠিক এক মিনিট আগে রবিন ভ্যান পার্সির সেই বিখ্যাত উড়ন্ত হেড ইকার ক্যাসিয়াসকে পরাস্ত করে। দ্বিতীয়ার্ধে ডাচরা আরও ৪টি গোল দিয়ে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ব্যবধানের হারের স্বাদ দেয়। স্পেন সেবার গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়।
দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ জার্মানি (২০১৮)
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার ধারায় এবার যুক্ত হয় জার্মানি। নকআউটে যেতে জার্মানির জয়ের বিকল্প ছিল না। ম্যাচের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কোনো গোল হয়নি। কিন্তু ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে দক্ষিণ কোরিয়ার কিম ইয়ং-গওন গোল করে বসেন। গোল শোধ করতে জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ার নিজের পোস্ট ছেড়ে কোরিয়ার হাফে চলে আসেন। এই সুযোগে কোরিয়া বল কেড়ে নিয়ে ফাঁকা পোস্টে বল জড়িয়ে জার্মানিকে বিদায় করে দেয়। ১৯৩৮ সালের পর এটিই ছিল জার্মানির প্রথম গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় এবং এশিয়ার কোনো দেশের কাছে প্রথম হার।
সৌদি আরব ২-১ আর্জেন্টিনা (২০২২)
টানা ৩৬ ম্যাচে অপরাজিত থেকে কাতারে পা রেখেছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১০ মিনিটে লিওনেল মেসির পেনাল্টি গোলে তারা এগিয়েও যায়। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার আরও কয়েকটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ৪৮ মিনিটে সালেহ আল-শেহরি গোল করে আর্জেন্টিনাকে চমকে দেন এবং এর ঠিক ৫ মিনিট পর সালেম আল-দাওসারির এক চমৎকার কোণাকুণি শটে লিড নেয় সৌদি আরব। পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে ট্রফি জিতলেও, প্রথম ম্যাচের এই ঐতিহাসিক হারটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।





