ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করে নানান সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে সংসদকে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেছেন, ’লক্ষাধিক অমুক্তিযোদ্ধা, যাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলা হয়, যদিও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বলতে কিছুই নেই, এরা অমুক্তিযোদ্ধা, তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সন্নিবেশিত করে ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাদি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। পর্যায়ক্রমে অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। পাশাপাশা তালিকার বাইরে থাকা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করা হবে।
মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে বিএনপির দলীয় সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে বিকেল সাড়ে তিনটায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, অমুক্তিযোদ্ধাদের সব সুবিধা থেকে দূরে রেখে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ণ করতে চায়। এটা সরকারের অঙ্গীকার। সব অমুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হতে বাদ দিয়ে আরও যারা দীর্ঘদিনের বঞ্চিত আছেন তাদের মন্ত্রণালয় যথাযথভাবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সন্নিবেশিত করে মূল্যায়ণ করতে চায়। এদেশ মুক্তিযোদ্ধার দেশ তা আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চায় মন্ত্রণালয়।
জামায়াত দলীয় এমপি জিএম নজরুল ইসলাম তার সম্পূরক প্রশ্নে জানতে চান তিনি নবম সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন কিন্তু ২০০৬ সালের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হতে তার নামটা বাদ দেওয়া হয়। ফলে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধার গৌরব হতে বঞ্চিত হয়েছেন। যদিও এলাকার সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জানে। এখন তিনিসহ বাদ পড়াদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত করা হবে কিনা?
জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, সদস্যদের যে কাগজপত্র আছে, সেগুলো মন্ত্রণালয়ে জমা দিলে, মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কাজ করবে এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। অতীতে যারাই বিরোধী দল করতেন, তাদেরই মুক্তিযুদ্ধের সনদ নিয়ে হয়রানি করা হতো, তাদের সুনাম নষ্ট করা হতো। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে।
বিএনপি দলীয় সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদ আমলে অনেক মুক্তিযোদ্ধার ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাদের সনদ স্থগিত করা হয়েছিল। বিভিন্নভাবে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। এসময় অনেক অমুক্তিযোদ্ধাও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় সন্নিবিশ হয়ে ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা অবৈধভাবে গ্রহণ করেছে। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ কাজগুলো অতিদ্রুত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে।
বিএনপির আরেক সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, হীরক রাজার দেশে সিনেমার যন্তরমন্তর ঘরের মতো ২০০৯ সালের পর থেকে রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধাকে রাজাকার বানানোর চেষ্টা ছিল। অনেক রাজাকার গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বের হয়েছেন। ১৭ বছরে যারা মুক্তিযোদ্ধা থেকে রাজাকার হয়েছেন আর রাজাকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, অমুক্তিযোদ্ধারা কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়েছেন এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। যন্তর মন্তর দিয়ে কীভাবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। অল্প দিনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারবেন বলে জানান মন্ত্রী।
এনসিপির সদস্য নোয়াখালী-৬ আসনের আবদুল হান্নান মাসউদের প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান নাম যোগ করে এই মন্ত্রনালয়ের নাম বড় করার পরিকল্পনা আপাতত নেই। একই সদস্যের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জানান, জুলাই যোদ্ধাদের সমস্যা সমাধানে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যথাযথ কাজ করবে।
বিএনপি দলীয় সদস্য কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে কেবলমাত্র ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র শ্রেণির কৃষকদের জনপ্রতি দুই হাজার ৫০০ টাকা সার, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের জন্য প্রণোদনা হিসেবে কৃষি কার্ডের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
মন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে কৃষি পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে বীজ, সার, কীটনাশক ও অন্যান্য উপকরণ সহায়তা বাবদ ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ২২ হাজার কৃষক উপকৃত হয়েছেন। বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে কৃষক প্রতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে সরকারের এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ১২ লাখ কৃষক এতে উপকৃত হচ্ছেন।
বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন আপাতত নয়
চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম (রিতা) বলেন, ঢাকায় অবস্থিত দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করে অতীতের মতো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার কোনো সিদ্ধান্ত এখনও গ্রহণ করা হয়নি। ভবিষ্যতে আলাপ-আলোচনা করে বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এর আগে সরওয়ার জামাল নিজাম তার প্রশ্নে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আগের নামে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা সরকারের আছে কী না তা জানতে চান।
১৯৮০ সালে চালু হওয়া দেশের প্রধান এই বিমানবন্দরটির নাম ১৯৮৩ সালে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে নামকরণ’ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রাখা হয়। বর্তমানে এই নাম বহাল রয়েছে। তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আবারো নাম পরিবর্তনে দাবি উঠছে।





