কেউ বলছেন, রাজনীতির প্রধান ময়দান ঢাকায় সংগঠন পুনর্গঠনে আন্দোলনে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের সামনে আনা দরকার।
গেল ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এরপর থেকে দলটির বিভিন্ন স্তরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা ধীর গতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।
এ অবস্থায় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি আনতে চলতি বছরেই জাতীয় কাউন্সিল করতে চায় বিএনপি। যদিও কাউন্সিলের নির্দিষ্ট সময় এখনও ঘোষণা হয়নি, তবুও এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
সর্বশেষ ২০১৬ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হয়। এরপর তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের দমনপীড়নের মধ্যে আর কাউন্সিল আয়োজন করতে পারেনি দলটি। তাই ১০ বছর পর হতে যাওয়া কাউন্সিল ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে।
আলোচনায় সাংগঠনিক পুনর্গঠন
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, কেবল কমিটি পরিবর্তন নয়, বরং সংগঠনকে নির্বাচনমুখী ও কার্যকর করাই হবে মূল লক্ষ্য। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা, নিষ্ক্রিয় ইউনিটগুলো সচল করা এবং কর্মীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
সূত্রে জানা যায়, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় এমন নেতৃত্ব খোঁজা হচ্ছে যারা একদিকে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়, অন্যদিকে সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। এতে তরুণ ও উদ্যমী নেতাদের সামনে আনার পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতৃত্বকেও স্থান দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব কাঠামো গড়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
নীরবে চলছে দৌড়ঝাঁপ
নতুন কমিটির সম্ভাবনা ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নীরবে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। প্রকাশ্যে প্রচার-প্রচারণা না থাকলেও ভেতরে ভেতরে চলছে বিস্তর যোগাযোগ। কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থন তৈরি এবং নিজ নিজ গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে।
কেউ আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের সক্রিয় উপস্থিতি তুলে ধরছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও অবদান সামনে আনছেন। দলীয় শৃঙ্খলার কারণে এ নিয়ে প্রকাশ্যে আলাপ-আলোচনা কম হলেও অভ্যন্তরীণ আলোচনা এখন তুঙ্গে।
এদিকে দলের পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপির ভেতরে দুই ধরনের চিন্তাধারা স্পষ্ট হয়েছে।
প্রথম ধারা—মাঠকেন্দ্রিক নেতৃত্ব: একটি অংশ জোর দিচ্ছে আন্দোলনে সক্রিয় ও ত্যাগী নেতাদের সামনে আনায়। তাদের মতে, যারা দুঃসময়ে রাজপথে ছিলেন, তাদেরই নেতৃত্বে আনা উচিত। এতে কর্মীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে ও সংগঠন আরও গতিশীল হবে।
এই অংশ মনে করে, পূর্ণকালীন সংগঠক ছাড়া তৃণমূলকে সচল রাখা সম্ভব নয়। এমপি বা প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা নেতারা সময় দিতে না পারায় সংগঠনে স্থবিরতা তৈরি হয় বলেও তাদের অভিযোগ।
দ্বিতীয় ধারা—অভিজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধি নির্ভর নেতৃত্ব: অন্য অংশের যুক্তি, নির্বাচনে সফলতা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বুঝতে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব অপরিহার্য। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায় তাদের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, যা দল ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তাদের মতে, উন্নয়ন কার্যক্রম তৃণমূলে পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দক্ষিণে আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির শীর্ষ পদগুলোতে বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনসহ বেশ কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া আ ন ম সাইফুল ইসলাম, সাইদুর রহমান মিন্টু, লিটন মাহমুদ, আব্দুল মোনায়েম মুন্না, খন্দকার এনামুল হক এনাম, জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি মাহফুজ কবির মুক্তাসহ আরও কয়েকজন সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন।
বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বলেন, যেকোনো কমিটির মেয়াদ শেষ হলেই নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। কমিটি গঠন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার সিদ্ধান্ত পেলেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু হবে। যারা বিগত ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে এবং ৫ আগস্টের আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে ছিলেন তাদেরকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে।
জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি মাহফুজ কবির মুক্তা বলেন, ঢাকা মহানগর বিএনপির নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তিনি মনে করেন, নতুন কমিটিতে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, নির্যাতিত ও সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় নেতাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, অতীতে অনেক ত্যাগী নেতা বঞ্চিত হয়েছেন। এবার সঠিক ও নিবেদিত নেতৃত্ব বেছে নেওয়া গেলে মহানগর বিএনপি আরও শক্তিশালী হবে, যা দল ও সরকারের জন্য সহায়ক হবে।
সামনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে জাতীয়তাবাদী প্রচার দলের সভাপতি বলেন, সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নের পাশাপাশি সংগঠনকে আরও গতিশীল ও জনমুখী করতে হবে। একইসঙ্গে সুবিধাবাদী ও অনৈতিক অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে সঠিক নেতৃত্ব ও টিমওয়ার্ক নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুর রহমান মিন্টু বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন, তাদের মধ্য থেকেই মহানগর দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্ব নির্বাচন করা উচিত। তার মতে, নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের আনা প্রয়োজন, যারা সংগঠন ও কর্মীদের প্রতি আন্তরিক এবং কর্মীবান্ধব মানসিকতার।
তিনি আরও বলেন, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা শুধু দলের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।
উত্তরে আলোচনায় যারা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে শীর্ষ পদে বর্তমান আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্য সচিব মোস্তফা জামান, এস এম জাহাঙ্গীর, মামুন হাসান, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ও আনারুজ্জামান আনোয়ারসহ একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর বলেন, মহানগর নেতৃত্বে এমন ব্যক্তিদের দেখতে চাই, যারা বিতর্কমুক্ত, সাংগঠনিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সমাজে ইতিবাচক ভাবমূর্তি রাখেন। তার মতে, শৃঙ্খলাবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে এমন কাউকে নেতৃত্বে না আনাই দলের জন্য ভালো হবে।
তিনি বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন। পাশাপাশি তরুণ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তৃণমূল নেতারা ত্যাগী নেতৃত্বের মূল্যায়নের পক্ষে সরব। তাদের মতে, কঠিন সময়ে যারা সংগঠন ধরে রেখেছেন, তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তবে অন্য একটি অংশ অভিজ্ঞতার গুরুত্ব তুলে ধরে বলছে, নেতৃত্বে ভারসাম্য না থাকলে সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কেন্দ্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত
দলীয় নীতিনির্ধারকরা বলছেন, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আসবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি এবং সাংগঠনিক বাস্তবতা– সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই কমিটি গঠনের চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।
সামগ্রিকভাবে ‘মাঠের ত্যাগী না অভিজ্ঞ’ –এই প্রশ্নে আটকে আছে ঢাকায় বিএনপির নতুন নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ। তবে অধিকাংশ নেতার ধারণা, শেষ পর্যন্ত দুই ধারার সমন্বয়েই গড়ে উঠবে নতুন নেতৃত্ব।
কারণ, কেবল ত্যাগ বা কেবল অভিজ্ঞতা– কোনোটিই এককভাবে যথেষ্ট নয়। রাজধানীর জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর নেতৃত্ব গড়ে তুলতে প্রয়োজন উভয়ের সমন্বিত প্রয়োগ। আর সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির আগামী পথচলার রূপরেখা।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বাংলানিউজকে বলেন, বিগত সাধারণ নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীতে বিরোধী দলের শক্ত অবস্থান দেখা গেছে। সেজন্য বিএনপির এমন নেতা বেছে নেওয়া উচিত, যিনি সংগঠনকে এমনভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারবেন, যাতে জনগণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই সরকারি সেবাসমূহ সহজলভ্যভাবে উপভোগ করতে পারে। নেতৃবৃন্দ যাতে সবসময় ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ পরিহার করে সংযত ও সুশৃঙ্খলতার সঙ্গে নগরবাসীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে যাদের বিষয়ে ন্যূনতম অভিযোগ আছে, তাদের নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখাই বাঞ্ছনীয়। তৃণমূলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ সহজে তাদের কাছে নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।
তার মতে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণে হাবিব উন নবী খান সোহেল, ব্যারিস্টার নাসির উদ্দীন অসীম, মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতো মনোনয়নবঞ্চিত নেতাদের মূল্যায়ন করা যেতে পারে। উত্তরে অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, মামুন হাসানের মতো নেতাদের সামনে নিয়ে আসলে দল চাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।




