আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এর প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাতে এসব তথ্য জানায় ইয়েনি সাফাক।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)-এর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক মূল্যায়ন নিয়ে বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সংকট ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
মার্চ মাস থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্যে নজিরবিহীন বাধার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত রুটে এলএনজি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি হয়েছে। এতে ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে গ্যাসের দাম ২০২৩ সালের শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক এলএনজি উৎপাদনও আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক নতুন এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উচ্চমূল্য ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো ইতিমধ্যে তাদের পুরোনো প্যাটার্ন পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। ইউরোপীয় বাজারে মার্চ মাসে আগের বছরের তুলনায় গ্যাসের চাহিদা ৪ শতাংশ কমেছে। এর পেছনে আংশিকভাবে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সাশ্রয়মূলক পদক্ষেপও কাজ করেছে। তবে এই চাহিদা-ভিত্তিক সমন্বয় বর্তমান কাঠামোগত সরবরাহ সংকট মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বড় ধরনের দুর্বলতা তুলে ধরেছে। তারা সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদার এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব পদক্ষেপ না নিলে আমদানি-নির্ভর অঞ্চলগুলো—বিশেষ করে ইউরোপ ও তুরস্ক—দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিতে থাকবে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সত্তরের দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) মনে করছে, এবারকার পরিস্থিতি ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে—এমনকি কোভিড-১৯ মহামারি বাইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইরান-সম্পর্কিত সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে, যার দ্রুত সমাধান নেই। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ কমে যাচ্ছে, আর সামনে আরো সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।
এর প্রভাব ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে দেখা যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কা ও মায়ানমারে জ্বালানি রেশনিং চলছে, ফিলিপিন্সে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে। ভারত, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোথাও বিকল্প জ্বালানিতে ঝুঁকতে হচ্ছে।
উচ্চমূল্যের কারণে অনেক দেশ আবার কয়লার ব্যবহার বাড়াচ্ছে, তবে একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক বাড়ছে, এবং এসব খাতে বিনিয়োগও বাড়ছে—বিশেষ করে চীনে।
এদিকে কাতারের রাস লাফান এলএনজি স্থাপনায় হামলার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। উৎপাদন স্বাভাবিক হতে ৩–৫ বছর সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি অবকাঠামো ও কাঁচামাল সরবরাহেও বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় নতুন জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন আরো কঠিন হয়ে পড়ছে।





