শুল্ক নিয়ে ট্রাম্প পিছু হটবেন না, তাঁর সে অবস্থাও নেই

ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন অভিধানে তাঁর প্রিয় শব্দ হলো ট্যারিফ বা শুল্ক। আদালতের রায়ের পর এখন কি তিনি নতুন কোনো শব্দ খুঁজছেন? উত্তর- না। পরাজয় অস্বীকারের চিরাচরিত দর্শন মেনে তিনি ইতোমধ্যে লড়াই শুরু করেছেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের ভাবমূর্তিতে সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে আদালতের রায়। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার তিনি ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’-এ বার্ষিক ভাষণ দেবেন। এর আগে আরও উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। যেটিকে তাঁর ভাবমূর্তির ক্ষতির প্রতিশোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় অনেক রিপাবলিকানই এখন কঠিন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পক্ষে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবাধ্য মনোভাব তাঁর নিজের এবং দলের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বয়ে আনছে। এরই মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের সমালোচনা করার উপযুক্ত সুযোগ পেয়েছে। তারপরও ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো দেখাচ্ছে, তিনি এখনও বিশ্বাস করেন শুল্কই সমৃদ্ধির দুয়ার খুলে দেবে। কিন্তু সম্ভাব্য বাস্তবতা হলো- উচ্চ আমদানি শুল্কের বিপরীতে কয়েক কোটি মার্কিন ভোটারের ওপরও ব্যয়ের বোঝা বাড়বে।

এরই মধ্যে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, শুল্ক নীতিকে টিকিয়ে রাখতে প্রেসিডেন্ট তাঁর হাতে থাকা বিকল্প আইনগুলো ব্যবহার করবেন। কিন্তু তাঁকে থামাতে ডেমোক্র্যাটরাও চুপ করে বসে নেই। দলটির সিনেটর অ্যান্ডি কিম বলেছেন, পাল্টা শুল্কের কারণে মানুষের যে বাড়তি খরচ হয়েছে, সেই অর্থ ফেরত দিতে তারা ট্রাম্পকে বাধ্য করবেন। এ সংক্রান্ত একটি আইন তৈরির কাজ চলছে।

কেন পিছু হটবেন না?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাদ দিতে না পারার পেছনে দুটি কারণ আছে। প্রথমত, তিনি শুল্কের ওপর প্রায় অন্ধ বিশ্বাস রাখেন। এই নীতি সবসময় কাজ করে না- এমন কোনো প্রমাণেরও তিনি তোয়াক্কা করেন না। সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়লেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ কম।

গত শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকাকে ফের মহান করার জন্য গত এক বছরে তিনি অত্যন্ত কার্যকরভাবে শুল্ক ব্যবহার করেছেন। কিন্তু নতুন তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি অপরিবর্তিত আছে। উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থানও কমে গেছে।

ট্রাম্পের নতিস্বীকার না করার দ্বিতীয় কারণটি খোদ শুল্ক সংক্রান্ত ক্ষমতা। নিরঙ্কুশ প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতা অর্জন এবং সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করে দেওয়ার সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার একটি মাধ্যম হলো শুল্ক। আদালতের রায়ের পর গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে তাঁর একটি মন্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নতুন শুল্ক আরোপের জন্য তিনি কেন কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করছেন না? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাকে তা করতে হবে না। শুল্ক আরোপ করার অধিকার আমার আছে।’

আধুনিক যুগের যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে ট্রাম্প শুল্ককে অনেক বেশি বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করেছেন। যা অর্থনৈতিক নীতির গণ্ডিও ছাড়িয়ে গেছে। কোনো দেশ তাঁকে রাগান্বিত করলে শাস্তি হিসেবে শুল্ককে ব্যবহার করেছেন। যেমন- ব্রাজিল। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ট্রাম্পের ঘনিষ্ট বন্ধু হিসেবে পরিচিত। যখন বলসোনারোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির তদন্ত শুরু হলো, তখনই দেশটির ওপর ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক চাপিয়ে দেন ট্রাম্প।

কোনো বিশ্বনেতা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন না করলেও উচ্চ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন, কথা বলার ধরন পছন্দ না হওয়ায় তিনি সুইজারল্যান্ডের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছেন। ধারণা করা হয়, সাবেক প্রেসিডেন্ট কারিন কেলার-সাটারের কথা বলার ধরন ট্রাম্পের পছন্দ হয়নি।

কিন্তু ভবিষ্যতে ক্ষমতার এমন যথেচ্ছ ব্যবহার সম্ভবত কঠিন হতে চলেছে। শুল্ক বজায় রাখার জন্য ট্রাম্প এখন যেসব বিকল্প ক্ষমতা ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন, তাতে অনেক আইনি বাধ্যবাধকতা ও সীমাবদ্ধতা আছে। তিনি এখন আর চাইলেই নিজের খেয়ালখুশি মতো শুল্কের হার বাড়াতে পারবেন না।

ট্রাম্প ব্যবসায়ী মানুষ। তাঁর বৈশ্বিক দর্শনও সরাসরি লেনদেনের মতো। তিনি মনে করেন, শুল্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়া মানে প্রতিদ্বন্দ্বি দেশগুলোর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হওয়া। চলতি বছর তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিন্তু আদালত পাল্টা শুল্কের ক্ষমতা খর্ব করায় ওই বৈঠকে দরকষাকষির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে বড় কোনো কার্ড অবশিষ্ট থাকলো না।

এই হতাশা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেও ফুটে উঠেছে। গত শুক্রবার তিনি বলেন, ‘যেসব বিদেশি দেশ বছরের পর বছর আমাদের ঠকিয়ে আসছে তারা এখন উল্লাসিত। খুবই খুশি। রাস্তায় নেমে নাচানাচি করছে। কিন্তু আমি আপনাদের নিশ্চিত করছি, তাদের এই আনন্দ বেশিদিন টিকবে না।’ অর্থ্যাৎ, ক্ষমতার মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠা ট্রাম্প তাঁর ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য হলেও শুল্কের নীতি থেকে পিছু হটবেন না।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ