প্রকাশক সমাজের মতামত উপেক্ষা করে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ শুরুর ঘোষণা দেওয়ায় গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন দেশের সৃজনশীল প্রকাশকরা। তাদের মতে, রোজার মধ্যে বইমেলা আয়োজনের এই একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবতাবিবর্জিত, অগণতান্ত্রিক এবং প্রকাশনা শিল্পের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাংলা একাডেমির একতরফা ঘোষণায় মেলা ‘প্রাণহীন’ হতে পারে।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ বইমেলার তারিখ ঘোষণা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় এক যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশকরা বলেন, শত শত প্রকাশকের অস্তিত্ব সংকট ও যৌক্তিক দাবিকে উপেক্ষা করে এ সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে, বাংলা একাডেমি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত বইমেলা আয়োজনের ঘোষণা দিলেও নির্বাচনকালীন বাস্তবতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমর্থন না থাকায় সেটি বাতিল হয়। পরবর্তীতে কোনো অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ বলে মন্তব্য করেছেন প্রকাশকরা।
প্রকাশকরা বলেন, বাংলা একাডেমি ঈদের পরে বইমেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে ঝড়-বৃষ্টি ও গরমের আশঙ্কার কথা বললেও তারা চোখের সামনে থাকা নিশ্চিত মানবিক ও বাণিজ্যিক বিপর্যয়কে উপেক্ষা করছে। রোজার দিনে বইমেলা শুরু হলে পাঠক-দর্শনার্থীর উপস্থিতি কমে যাবে, ফলে মেলাটি কার্যত পাঠকশূন্য ও প্রাণহীন একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।
তারা আরও বলেন, বইমেলার প্রাণ হলো স্টলকর্মীরা, যাদের বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী। রোজা রেখে সারাদিন কাজ করা এবং ইফতার ও দীর্ঘ তারাবির নামাজের পর আবার স্টলে দায়িত্ব পালন করানো মানবিক বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। এটি শ্রম ও মানবাধিকারের প্রশ্নও তুলে ধরে।
প্রকাশক সমাজের মতে, গত দেড় বছরে কাগজ ও প্রকাশনা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিক্রি কমে যাওয়ায় প্রকাশনা শিল্প ইতোমধ্যেই চরম সংকটে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোজার মধ্যে একটি ব্যর্থ মেলা আয়োজন করলে তা প্রকাশকদের জন্য নিশ্চিত আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকাশকরা বাংলা একাডেমির প্রতিপক্ষ নন; বরং অংশীজন ও সহযোগী। মেলার আয়োজন একাডেমির হাতে থাকলেও মেলার মূল শক্তি হলো প্রকাশক ও পাঠক। যেখানে প্রকাশকরা প্রস্তুত নন এবং পাঠকদের উপস্থিতি নিশ্চিত নয়, সেখানে মেলার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
প্রকাশকরা জানান, ঈদের পর বইমেলা আয়োজন করা হলে সম্ভাব্য ঝড়-বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতির দায় তারা নিজেরাই নিতে প্রস্তুত। কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে মেলা আয়োজন করে যে নিশ্চিত ক্ষতির দিকে প্রকাশকদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তার দায়ভার কার-সে প্রশ্নও তোলেন তারা।
এদিকে প্রকাশক সমাজের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইতোমধ্যে ৩২টি প্যাভিলিয়ন ও ১৫২টি স্টলের প্রকাশক লিখিতভাবে রোজার মধ্যে বইমেলা না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি আজকে জুম মিটিং এ প্রকাশকরা তাদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তাদের দাবি উপেক্ষা করে বইমেলা আয়োজন করা হলে সেটি ইতিহাসের অন্যতম ব্যর্থ ও বিতর্কিত আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হবে বলে সতর্ক করেন তারা।
এই যৌথ অবস্থানপত্রে সাধারণ প্রকাশকদের পক্ষে স্বাক্ষর করেন- মেছবাহউদ্দীন আহমদ (প্রকাশক, আহমদ পাবলিশিং হাউজ), এ. কে. নাসির আহমেদ (প্রকাশক, কাকলী), মাজহারুল ইসলাম (প্রকাশক, অন্যপ্রকাশ), মনিরুল হক (প্রকাশক, অনন্যা), সৈয়দ জাকির হোসাইন (প্রকাশক, অ্যাডর্ন), মো. জহির দীপ্তি (প্রকাশক, ইতি প্রকাশন; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি-২০২৬), মাহরুখ মহিউদ্দীন (প্রকাশক, ইউপিএল; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি-২০২৬), মাহাবুব রাহমান (প্রকাশক, আদর্শ; সদস্য, অমর একুশে বইমেলা কমিটি-২০২৬), মো. মোবারক হোসেন (পাণ্ডুলিপি সমন্বয়ক, প্রথমা প্রকাশন), ইকবাল হোসেন সানু (প্রকাশক, লাবনী), মিজানুর রহমান (প্রকাশক, শোভা প্রকাশ) এবং ইফতেখার আমিন (প্রকাশক, শব্দশৈলী)।
প্রকাশকরা সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জেদ ধরে রেখে একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে অবিলম্বে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হোক এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর উৎসবমুখর পরিবেশে অমর একুশে বইমেলা আয়োজনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অন্যথায় উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়ভার সম্পূর্ণভাবে আয়োজক প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে বলে তারা জানান।





