খালেদা জিয়ার জানাজায় জনসমাগম ও বিশ্বে উল্লেখযোগ্য শেষবিদায়

খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পথে মানুষের যে ঢল নেমেছিল, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে পৌঁছাতে পারেননি। বুধবার যতই বেলা গড়ায় সংসদ ভবন থেকে মানুষের ভিড়ের বিস্তার ততই আশপাশের এলাকায় দৃশ্যমান হয়।

সংসদ ভবনের সামনের দুটি বিশাল মাঠ লোকে পূর্ণ ছিল। পাশের ফার্মগেট, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ হয়ে কারওয়ানবাজার পর্যন্ত জানাজায় মানুষের সারি ছিল। অপরদিকে ধানমন্ডির সোবহানবাগ মসজিদ থেকে শ্যামলীর শিশুমেলা, মিরপুর সড়কের দুপাশেও জানাজায় দাঁড়িয়েছিলেন অনেকে। নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না হলেও জানাজায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ধারণা, বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসনকে বিদায় জানাতে জড়ো হয়েছিল কয়েক লাখ মানুষ।

তবে বিভিন্ন এলাকার সড়কে মানুষের উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তিনটি অনুমিত সংখ্যা প্রকাশ করেছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য ডিসেন্ট। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত জনসমাগমের এলাকা, গুগল ম্যাপে সেসব এলাকার রাস্তাগুলোর দৈর্ঘ্য ও প্রশস্ততার পরিমাপ এবং বিশ্লেষকের সহায়তা নিয়ে মোট আয়তন ও জনসমাগমের সংখ্যা তুলে ধরেছে। ডিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ৪ লাখ বর্গমিটারের প্রতি বর্গমিটার ৪ জন করে ধরলে সমাগম হয়েছিল প্রায় ১৬ লাখ। প্রতি বর্গমিটারে ৬ ও ৮ জন করে ধরলে সম্ভাব্য সমাগম হয়েছিল যথাক্রমে ২৪ ও ৩২ লাখ।

অংশগ্রহণকারীরা যা বলছেন
জনতার স্রোতে শামিল হয়েছিলেন ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। তাদেরই একজন যাত্রাবাড়ীর আসিফ মাহমুদ। তিনি ছিলেন কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে জানাজার সারিতে। আসিফ বলেন, কেবল কারওয়ান বাজার মোড় ও এর পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৩০ হাজার।

জানাজায় অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন (৭০)। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেছেন, কখনোই খালেদা জিয়ার পক্ষে ভোট দেননি। তবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতেই এসেছেন। মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার নাতিকে সঙ্গে করে এসেছি, একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে শেষ বিদায় জানাতে। যার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

শোকাহত শারমিনা সিরাজ নামের আরেকজন এএফপিকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। অদূর ভবিষ্যতে নারীদের নেতৃত্বের আসনে কল্পনা করাও কঠিন।’

বিশ্বে উল্লেখযোগ্য শেষবিদায়
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শেষবিদায়ে সবচেয়ে বেশি জনসমাগমের ঘটনাটি ভারতে। ১৯৬৯ সালে তামিলনাড়ুর প্রথম মূখ্যমন্ত্রী কনজিভরম নটরাজন আন্নাদুরাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জড়ো হয়েছিলেন ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ।

আন্নাদুরাই ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন মাদ্রাজের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর আমলেই রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে তামিলনাড়ু রাখা হয়। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা বক্তা ও তামিল ভাষার প্রথিতযশা লেখক। সাহিত্যকর্ম ও রাজনৈতিক ভাষণ তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমাগমের আরও উদাহরণ পাওয়া যায় হিস্ট্রি ডটকম- এর ওয়েবসাইটে। ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি হালনাগাদ হওয়া নিবন্ধে আন্নাদুরাইসহ সাতজন ব্যক্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমাগমের তথ্য আছে। তাদের একজন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি।

১৯৮৯ সালে খোমেনির মরদেহ কবরস্থানের দিকে নেওয়ার সময় প্রায় ২০ মাইল দীর্ঘ মিছিল তৈরি হয়। যা দেখে ধারণা করা হয় জনসমাগম ছিল প্রায় ১ কোটি। তখনকার জনসংখ্যা বিবেচনায় ওই সমাগম ছিল ইরানের মোট জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ।

আয়াতুল্লাহ খোমেনির দাফনের সময়ে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে ওই বিপুল জনসমাগম ভিন্ন পরিবেশও তৈরি করেছিল। মরদেহ বহনকারী সাধারণ কাঠের কফিন ছোঁয়ার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কফিন ও মরদেহ মাটিতে পড়ে যায়। পরে সশস্ত্র রক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মরদেহটি একটি হেলিকপ্টারে তুলে সরিয়ে নেওয়া হয়। দাফন প্রক্রিয়া পিছিয়ে ভিন্ন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সেদিনও শোকাহতরা হেলিকপ্টার উড্ডয়নের সময় ল্যান্ডিং গিয়ার আঁকড়ে ধরে ছিলেন।

হিস্ট্রি ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন মারা যান ১৮৬৫ সালে। তাঁর মরদেহ ওয়াশিংটন থেকে ট্রেনে করে নেওয়া হয়েছিল ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। ওই যাত্রাটি কার্যত একটি চলমান অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মিছিলে পরিণত হয়। ট্রেনটি পেনসিলভানিয়া, নিউইয়র্ক, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা হয়ে ইলিনয় পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ লাগে। এসব অঙ্গরাজ্য অতিক্রমের সময় আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ পথে পথে দাঁড়িয়েছিলেন।

ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো মারা যান ১৮৮৫ সালে। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে আর্ক দো ত্রিয়ম্ফ থেকে প্যান্থেয়ন পর্যন্ত শোকমিছিল পর্যবেক্ষণ করেন ২০ লাখের বেশি মানুষ। যা সে সময় প্যারিস শহরের মোট জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। এ ছাড়া, ১৯৫২ সালে ডিউক অব ওয়েলিংটনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শোভাযাত্রায় দশ হাজারের বেশি মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেন। আর যাত্রা দেখতে পথে ভিড় করেছিলেন ১৫ লাখের বেশি মানুষ। রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ দ্বিতীয় জন পলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অংশ নিতে রোমে জড়ো হয়েছিলেন ৪০ লাখ মানুষ। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের ফর্মুলা ওয়ান রেসিং কার তারকা আয়রটন সেন্নাকে শ্রদ্ধা জানাতে সাও পাওলোতে জড়ো হওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ।

হিসাব কীভাবে হয়
এত লোকসমাগমের হিসাব কীভাবে করা হয়েছিল সে তথ্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ও হিস্ট্রি ডটকমের ওয়েবসাইটের নিবন্ধে উল্লেখ নেই। গবেষণাভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশন গত ৭ আগস্ট এক নিবন্ধে বলে, ভিড় গণনার একক কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নেই। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরিস্থিতির উপযোগী নানা কৌশলের সমন্বয়ে একটি পদ্ধতিগত ‘টুলবক্স’ ব্যবহার করেন। তবে প্রতিটিরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা আছে।

সবচেয়ে পুরোনো এবং একই সঙ্গে সহজ পদ্ধতি হলো ভিড়ের কয়েকটি নমুনা অংশে (আকাশ থেকে তোলা ছবির ভিত্তিতে) প্রতি বর্গমিটারে মানুষের ঘনত্ব অনুমান করা। এরপর সেটিকে গুণ করা হয় জনসমাগম হওয়া মোট এলাকার আয়তনের সঙ্গে। তাত্ত্বিকভাবে এটি সহজ মনে হলেও বাস্তবে এই পদ্ধতি নানাবিধ দুর্বলতা আছে। মানব পর্যবেক্ষক কিংবা অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রেও প্রতি বর্গমিটারে দুই, তিন বা চারজন মানুষের পার্থক্য নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন।

আরেকটি সমস্য হলো ভিড়ের ঘনত্ব সাধারণত এক সমান হয় না। মানুষ সাধারণত কোনো কেন্দ্রবিন্দুর আশপাশে বেশি জমায়েত হয় এবং অন্য জায়গায় তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। ফলে কোনো একটি অংশের হিসাব ধরে পুরো এলাকার ওপর প্রয়োগ করলে একেবারে সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না। অনুমিত সংখ্যা পাওয়া যায়।

দ্য কনভারসেশন বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ, আকাশ থেকে তোলা ছবি ও ড্রোনের চিত্র ব্যবহার করে ‘ইমেজ প্রসেসিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিড় গণনা করা যায়। এসব পদ্ধতির মধ্যে আছে, কম থেকে মাঝারি ঘনত্বের ভিড়ের ক্ষেত্রে কার্যকর ‘টেক্সচারভিত্তিক কৌশল’, আবার আলাদা করে মাথা বা শরীর শনাক্ত করতে সক্ষম ‘অবজেক্ট ডিটেকশন মডেল’ও ব্যবহৃত হয়।

খোলা জায়গায় যেখানে দৃশ্যমানতা ভালো থাকে সেখানে এসব প্রযুক্তি বেশ নির্ভুল ফল দেয়। তবে ছায়া, অপর্যাপ্ত আলো, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ছবি ভালো না এলে হিসাবে নির্ভুলতার হার কমে যায়।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ