প্রায় দুই যুগ আগে চার মাসের সেলাই প্রশিক্ষণ নেন আইনুন্নাহার শিউলি। এর পর একটি সেলাই মেশিন কিনে বাড়িতে কাজ শুরু করেন। এতে নিজের জীবন যেমন বদলে গেছে, তেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন প্রায় ৪০ হাজার নারী। এসব নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন আইনুন্নাহার। তারা আজ প্রতিষ্ঠিত; আয় করে অবদান রাখছেন সংসারে। এদিকে কাজের জন্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আইনুন্নাহার। এসব স্বীকৃতি তাঁকে জুগিয়েছে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।
ময়মনসিংহ নগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের জিগাতলা মোড় এলাকায় আইনুন্নাহারের বাড়ি। একটি সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ শুরু করা এই নারী আজ তিন প্রতিষ্ঠানের মালিক। সেগুলো হলো– তৃণমূল নারী উন্নয়ন সমিতি, তৃণমূল যুব বৈচিত্র্য ও তৃণমূল কারুপণ্য। সেলাইয়ের কাজ করে এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে জমি ও বাড়ি করেছেন আইনুন্নাহার। সন্তানদের করেছেন উচ্চশিক্ষিত। ছেলে সোনালী ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং মেয়ে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে কর্মরত।
কিশোরগঞ্জের মেয়ে আইনুন্নাহার বিয়ের পর সংসারের খরচ মেটাতে কিছু করার কথা ভাবেন। সেই ভাবনা থেকে ২০০৩ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে সেলাই প্রশিক্ষণ নেন। ওই সময় দুই হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করেন মেয়েদের পোশাক তৈরির কাজ।
তিনি বলেন, ‘২০০৮ সাল পর্যন্ত ঘরে বসেই কাজ করি। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম বানাতাম। সেলাইয়ের কাজ ভালো হওয়ায় বাড়তে থাকে কাজের ফরমায়েশ। একা কাজ সামলাতে পারছিলাম না। তখন আরেক ভাবনা মাথায় আসে।’
কর্মী নিয়োগ না করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
কাজ বেশি পেয়ে আইনুন্নাহার সিদ্ধান্ত নিলেন, কর্মী নিয়োগ না করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। ২০০৮ সালে একটি প্রশিক্ষণ হাউস চালু করেন তিনি। সেখানে প্রথমে ২০ নারীকে নিজের বাড়িতে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। তিন মাসের এই প্রশিক্ষণ ছিল বিনামূল্যে।
প্রশিক্ষণ শেষে পাঁচজনকে নিজের কাছে রেখে দেন। বিভিন্ন স্থান থেকে পোশাকের অর্ডার নিয়ে তাদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে থাকেন।
মোড় ঘুরে গেল একদিন
২০০৯ সালে ময়মনসিংহের উন্নয়ন সংস্থা আসপাডা পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক আবদুর রশিদ একদিন তাঁর কাজ দেখেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বিনা সুদে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেন। এই আর্থিক সহায়তা তাঁর সাহস আরও বাড়িয়ে তোলে। এরপর থেকে প্রতিবছর চারটি ব্যাচে প্রশিক্ষণ দেন। প্রতি ব্যাচে ৩০ নারী বিনামূল্যে সেলাই ও বুটিকের কাজ শেখেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানের পুঁজি দাঁড়িয়েছে কোটি টাকায়।
যাত্রা ছিল চ্যালেঞ্জের
একসময় আইনুন্নাহারের কাজের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি ছিল না। তিনি বলেন, ‘তখন আমার ছেলে ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ত। কিন্তু আমার কাজের স্বীকৃতি না থাকায় তাকে সামনের বেঞ্চ থেকে পেছনের বেঞ্চে বসিয়ে দেওয়া হতো। সবাই ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। এর পরও কাজ বন্ধ করিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিকে দোকানদাররা পণ্য নিয়ে ঠিকমতো টাকা দিতেন না। এ রকম বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছি। তবে দমে যাইনি। নিজের ব্যবসা থেকে উপার্জিত টাকা দিয়ে জিগাতলায় ১৬ শতাংশ জায়গা কিনে বাড়ি করেছি। ঢাকায়ও শোরুম আছে।’
আইনুন্নাহার আশা করেন, সরকার যদি তাঁকে জমি বরাদ্দ দেয়, তাহলে নারীদের নিয়ে একটি বড় কারুপণ্যের কারখানা প্রতিষ্ঠা করবেন। সেখানে অসংখ্য নারীর কর্মসংস্থান হবে।
পণ্য যাচ্ছে বিদেশেও
আইনুন্নাহারের কারখানায় মসলিন, সেমি মসলিন, ব্লক, বাটিক, কুর্তি, পর্দাসহ বেডশিট ও সোফার কুশন তৈরি হয়। এ ছাড়া বেডশিট, নকশিকাঁথা, থ্রিপিস, ছেলেদের পাঞ্জাবি, পাটের তৈরি ব্যাগ, পুতুল ও শোপিস তৈরি করে থাকেন। তাঁর পণ্যের চাহিদা দেশ-বিদেশে সমান। ঢাকার অনেক দোকানে তাঁর প্রতিষ্ঠানের তৈরি পণ্য সরবরাহ হয়। ময়মনসিংহ ছাড়াও রাজধানীর মিরপুরে ‘জয়িতা’ নামে তাঁর একটি দোকান রয়েছে।
আইনুন্নাহারের তৈরি পোশাক এখন ভারত, নেপাল, চীন, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও কানাডায় রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষভাবে তাঁর কারখানায় তৈরি নকশিকাঁথা বিক্রি হয় কানাডায়। প্রতি মাসে তিনি আট থেকে ১০ লাখ টাকার পণ্য তৈরি করে বিক্রি করেন। তিনি প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেন। সাত-আটটি দেশের বিভিন্ন মেলায় পণ্য বিক্রি করেছেন এই নারী।
কর্মরত ৬০ নারী
বর্তমানে আইনুন্নাহারের কারখানায় ৬০ নারী কর্মরত। তিনি বলেন, ‘বাড়িতেই ট্রেনিং সেন্টারের মতো জায়গা রয়েছে। সেখানে বসে কিছু কাজও করেন নারীরা। আমার কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে বাড়িতে বসে কাজ করে সরবরাহ করেন অনেকে। এদের মধ্যে ২৫ জন বেতনভুক্ত। এ ছাড়া এলাকার নারীদের ৪০টি সেলাই মেশিন দেওয়া আছে। তারা সেখানে কাপড় তৈরি করে জমা দিয়ে যান।’
আইনুন্নাহার বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অ্যাসেট প্রকল্পের আওতায় ৭২ নারীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে প্রত্যেক নারীকে ১৩ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণার্থী সুইটি আক্তার বলেন, ‘এখানে এসে হাতে-কলমে কাজ শিখে বুঝলাম, নারীরাও উপার্জন করতে পারে। এই প্রশিক্ষণ আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার প্রথম ধাপ।’
প্রশিক্ষণ নিয়ে সফল অনেকে
আইনুন্নাহারের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে সমাজে ‘আইকনিক ব্যবসায়ী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন ফাবিয়া আক্তার ও মাহমুদা আক্তার। উদ্যোক্তা ফাবিয়া বলেন, ‘আইনুন্নাহার আপা আমাদের উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর কাছ থেকে শিখে আজ আমি নিজের একটি ছোট বুটিক শপ দিতে পেরেছি। তিনি আমার কাছে আইকন।’
মাহমুদা বলেন, ‘আপা অর্থনৈতিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব শিখিয়েছেন। বর্তমানে আমার নিজের তিনটি দোকান আছে। আপা আমার মতো হাজারো নারীর জন্য একটা নির্ভরতার জায়গা।’
পাশে ছিলেন স্বামী
আইনুন্নাহারের স্বামী খন্দকার ফারুক আহমেদ একটি কনসালটেন্সি ফার্মের মালিক। তিনি বিভিন্নভাবে স্ত্রীকে সহযোগিতা করেছেন। ফারুক বলেন, ‘সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অনেক বাধা সত্ত্বেও আইনুন্নাহার হার মানেনি। আমি তাঁর পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। কারণ, আমি ওর একাগ্রতা আর মানুষের জন্য কিছু করার তাড়না অনুভব করতাম।’
শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা তাহমিনা নাসরিন বলেন, ‘একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হন, তখন পরিবারে এবং সমাজে তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। আইনুন্নাহারের এই কর্মযজ্ঞ আমাদের জন্য মডেল হতে পারে।’




