অস্কারে ৯৭ বছরের ইতিহাসে রেকর্ড ভাঙা ‘সিনার্স’ সিনেমায় কি আছে

বলা হতো ২০২৫ সালের যে সিনেমাটি নাকি হলিউড ধ্বংস করে দেবে-শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে উঠল বছরের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী চলচ্চিত্র। সিনার্স সিনেমাটি জিম ক্রো যুগের দক্ষিণাঞ্চলের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এক ভ্যাম্পায়ার হরর গল্প নিয়ে নির্মিত। যেখানে অধিকাংশ চরিত্রই কৃষ্ণাঙ্গ। আর সিনেমাটি ধারণ করা হয়েছে আইম্যাক্স সেভেন্টি এমএম ফরম্যাটে।

পরিচালক রায়ান কুগলার- যিনি ব্ল্যাক প্যান্থার ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে মার্ভেল এ নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রেখেছেন। এই ছবিটি নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহের মুখে ছিলেন। শোনা যায়, মাত্র দুই মাসে লেখা একটি স্ক্রিপ্ট নিয়ে প্রায় একশ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের সিনেমা বানানোয় অনেকে মনে করেছিলেন—এটি কুগলারের সাধ্যের বাইরে। এমনকি ওয়ার্নার ব্রাদার্স-কে নিয়েও কটাক্ষ কম হয়নি; কারণ তারা শুধু বিপুল অর্থই বিনিয়োগ করেনি, বরং কুগলারকে চূড়ান্ত কাটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং পঁচিশ বছর পর ছবির সম্পূর্ণ স্বত্বও দিয়ে দেয়। হলিউড-এর অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিই মনে করেছিলেন, এই ঝুঁকি স্টুডিও ব্যবস্থার শেষ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু সিনার্স সেই সব সংশয়কে পাত্তা দেয়নি।

ইস্টার উইকএন্ড-এ মুক্তি পেয়ে ছবিটি যেন নিজেই এক ‘পুনরুত্থানের’ গল্প লিখে ফেলে। বিশ্বব্যাপী আয় করে তিনশ আটষট্টি মিলিয়ন ডলার, হয়ে ওঠে গত পনেরো বছরের মধ্যে সর্বাধিক আয় করা মৌলিক চলচ্চিত্র এবং সর্বকালের দশম সর্বোচ্চ আয় করা আর-রেটেড সিনেমা। টার্মিনেটর টু কিংবা দ্য হ্যাংওভার—এর চেয়েও বেশি আয় করে নেয় সিনার্স।

এমন এক সময়ে, যখন কৃষ্ণাঙ্গ ইতিহাস ও সংস্কৃতি আবারও রাজনৈতিক চাপের মুখে, সিনার্স নতুন করে আলোচনায় আনে ব্ল্যাক হিস্ট্রি, সাংস্কৃতিক মুছে ফেলা এবং বিনোদন শিল্পের ক্ষমতার রাজনীতি। ছবির ‘জুক জয়েন্ট’ দৃশ্য নিয়ে যেমন মিম তৈরি হয়েছে, তেমনি গভীর বিশ্লেষণও হয়েছে—এই স্থানগুলো আমেরিকান সঙ্গীতের ইতিহাসে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা নিয়ে।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কুগলারের দীর্ঘ গবেষণা। যদিও স্ক্রিপ্ট লিখতে সময় লেগেছে মাত্র দুই মাস, কিন্তু এর পেছনে ছিল মিসিসিপি ডেল্টা-র লোককথা, দাসপ্রথা-পরবর্তী সংস্কৃতি এবং ব্লুজ সংগীত নিয়ে বছরের পর বছর ধরে করা অধ্যয়ন। ছোটবেলায় তার প্রয়াত চাচা তাকে যে ব্লুজ রেকর্ডগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। উনিশশো ত্রিশের দশকের ফটোগ্রাফি, নেটিভ আমেরিকান মিথ, এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের চাইনিজ ইমিগ্র্যান্টদের ইতিহাস—সবই জায়গা পেয়েছে ছবিতে।

এই ইতিহাসের ভার সত্ত্বেও সিনার্স কখনোই তার মূল হরর-নির্ভর বেঁচে থাকার গল্প থেকে বিচ্যুত হয়নি। কস্টিউম ডিজাইনার রুথ ই কার্টার, সেট ডেকোরেটর মনিকে শ্যাম্পেন এবং প্রযোজক জিনজি কুগলার-এর সহায়তায় ছবির প্রতিটি স্তর হয়ে উঠেছে অর্থবহ।

অভিনয়ে বিশেষভাবে উজ্জ্বল হেইলি স্টেইনফেল্ড, ডেলরয় লিন্ডো ও ওয়ুনমি মোসাকু। মোসাকুর উপস্থিতি ভেঙে দিয়েছে হলিউড-এর প্রচলিত ধারণা—যে নায়িকারা কেবল তরুণ, রোগা ও ফর্সাই হতে হবে। অন্যদিকে মাইকেল বি জর্ডান তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় উপহার দিয়েছেন, দ্বৈত চরিত্রে এনে দিয়েছেন গভীরতা ও মানবিকতা।

প্রেক্ষাগৃহে হোক কিংবা এইচবিও ম্যাক্স-এ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে—সিনার্স মানুষকে কথা বলতে বাধ্য করেছে। সময়ের সংকট, ইতিহাসের দায় এবং সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবিয়েছে দর্শককে।

সব সংশয়, প্রশ্ন আর সমালোচনার পর রায়ান কুগলার এক কথায় নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন- আমি সিনেমায় বিশ্বাস করি। প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতায় বিশ্বাস করি। এটি সমাজের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আমাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।

সুত্র: দ্য গার্ডিয়ান অবম্বনে

 

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ