ইউরোপের যে দেশগুলোয় জনসমক্ষে নিকাব নিষিদ্ধ

ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে জনসমক্ষে মুসলিম নারীদের মুখ ঢাকা পোশাক, বিশেষত নিকাব বা বোরকা নিষিদ্ধ করার আইন কার্যকর হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারীর অধিকার, জননিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় সামাজিক মূল্যবোধের প্রশ্নে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

ইউরোপে প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে জনসমক্ষে মুখ ঢাকা পোশাক নিকাব অথবা বোরকা পরা নিষিদ্ধ করে আইন করা হয়। আইন অমান্য করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। ফ্রান্সের পর ২০১১ সালের জুলাই মাসে বেলজিয়াম একই ধরনের আইন কার্যকর করে যেখানে জনসমক্ষে মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে অস্ট্রিয়ার স্কুল-কলেজ, আদালতসহ জনসমক্ষে মুখ ঢাকা পোশাক করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে নেদারল্যান্ডসের স্কুল, হাসপাতাল ও গণপরিবহনের মতো জনসমক্ষে আংশিক নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। ডেনমার্কে ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে জনসমক্ষে মুখ ঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করে আইন জারি হয়, যেখানে আইন ভাঙলে জরিমানার বিধান রয়েছে। বুলগেরিয়ায় ২০১৬ সালে আইন করে নিকাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়। সুইজারল্যান্ডে গণভোটের মাধ্যমে ‘প্রকাশ্যে মুখ ঢাকা পোশাক’ নিষিদ্ধের প্রস্তাব পাস হয়েছে যা মূলত নিকাবকে বুঝায় এবং এটিও ইউরোপের কয়েকটি ক্যান্টন ও শহরে ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে বা কার্যকর হওয়ার পথে রয়েছে।

পর্তুগালে শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) দেশটির পার্লামেন্টে অধিকাংশ উন্মুক্ত স্থান বা জনসমক্ষে নিকাব পরা নিষিদ্ধ করার বিল পাস হয়েছে, যা এখন আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়।

এছাড়া ইতালির কিছু শহরে, স্পেনের কিছু অঞ্চলে, জার্মানির নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, যেমন স্কুলে বা গাড়ি চালানোর সময় নিকাব বা বোরকার ওপর বিধিনিষেধ জারি করেছে।

এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সরকার ও আইন প্রণেতারা সাধারণত কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরে থাকেন: ১. জননিরাপত্তা ও পরিচয় শনাক্তকরণ- তারা মনে করেন জননিরাপত্তার জন্য মানুষের মুখমণ্ডল উন্মুক্ত থাকা অপরিহার্য যাতে প্রয়োজনে দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করা যায়। ২. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে অনেক দেশের সরকার ও রাজনীতিবিদ যুক্তি দেন যে মুখ ঢাকা পোশাক ইউরোপীয় গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং সমাজে খোলামেলা যোগাযোগের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ৩. নারীর মুক্তি ও সমতা- কিছু মহল মনে করে নিকাব নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং এটি নারীর অধিকার ও সমতার পরিপন্থী।

অন্যদিকে, মানবাধিকার কর্মী ও মুসলিম সম্প্রদায় এই নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করে আসছে। সমালোচকদের মতে, নিকাব নিষিদ্ধ করা মুসলিম নারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের অধিকারকে খর্ব করে। অনেক মুসলিম নারী নিকাবকে তাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখেন। এই আইন মুসলিম নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক এবং তাদের সামাজিক জীবনকে সীমিত করে তোলে। অনেক দেশে নিকাব পরিধানকারী নারীর সংখ্যা খুবই কম ফলে এই আইন মূলত প্রতীকী এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হয়।

ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত ২০১৪ সালে ফ্রান্সের নিকাব নিষেধাজ্ঞাকে বহাল রেখে রায় দিলেও এই ইস্যুতে আইনি ও সামাজিক বিতর্ক এখনও বহাল রয়েছে। ইউরোপ জুড়ে এই আইন মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে এবং সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংহতির ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ