বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক কমলো ১ শতাংশ

জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বহুল আলোচিত পাল্টা (রেসিপ্রোকাল) শুল্কসংক্রান্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক দেশটির বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। এ জন্য বেশকিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে স্থানীয় সময় সকাল ১১ টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা) চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পাল্টা শুল্ক ইস্যুতে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রকাল ট্রেড চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শুরুতে এ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা দুজনই সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না। সূত্রগুলো জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের কাছাকাছি হওয়ায় তারা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরাসরি যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন। বাণিজ্য উপদেষ্টা বাংলাদেশের পক্ষে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

এদিকে চুক্তি সই অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি দল ওয়াশিংটনে চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, পাল্টা শুল্ক ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, এ ছাড়াও বাংলাদেশের ওষুধপণ্য, মাছ, পেপারবোর্ডসহ আরও কিছু পণ্যও শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২ হাজার ৫০০টি বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে প্রবেশের সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে।

এদিকে চুক্তির পর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রেস উইং থেকে এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘এই চুক্তি আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে এক ঐতিহাসিক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই একে অপরের বাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তি প্রবেশাধিকার পাবে।’

চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক শুল্ক হার কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনবে। এই হার আগে ৩৭ শতাংশ ছিল, যা গত বছরের আগস্টে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, মার্কিন উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিতে একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

বাংলাদেশের প্রধান আলোচক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, ‘পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নামানো আমাদের রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা বয়ে আনবে। আর নির্দিষ্ট বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেশের তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের গতি সঞ্চার করবে।’

এদিকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে। এর বিনিময়ে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য নিজ দেশের বাজারে প্রবেশের পথে বাণিজ্য বাধা হ্রাস করবে, যে দাবি যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরে করে আসছে। সাধারণত বড় কোনো ঘোষণা দেওয়ার জন্য নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালের দ্বারস্থ হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবারও তা-ই করেছেন তিনি। এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ফোনালাপ হয়। ট্রাম্প বলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কিনবে; সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা হলো, তারা ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। শুরুতে বাংলাদেশের জন্য হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে ৩৫ শতাংশ ‘পাল্টা শুল্ক’ ঘোষণা করে আলোচনার সুযোগ রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা বৈঠকের পর ৩১ জুলাই এ হার ২০ শতাংশে নামানোর ঘোষণা এলেও কোনো চুক্তি হয়নি। এরপর হার আরও কমানো ও যুক্তরাষ্ট্রের তুলা দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা চলে।

এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতিসহ বাংলাদেশকে নানা ছাড় দিতে হয়। এ জন্য দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ৬০০ কোটি ডলার কমাতে এক-দেড় বছরে অতিরিক্ত ১৫০ কোটি ডলার আমদানি বাড়াতে সম্মত হয়েছে ঢাকা। এ ঘাটতি কমাতে এরই মধ্যে গম, সয়াবিন তেল, ভুট্টা, তুলাসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য; উড়োজাহাজ ও উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ; তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ইত্যাদি আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় শুল্ক, অশুল্ক, ডিজিটাল বাণিজ্য, প্রযুক্তি, উৎসবিধি ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত শর্তও রয়েছে। তবে চুক্তিটির বিস্তারিত এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জানা যায়নি। সোমবার উপদেষ্টা পরিষদে এটি অনুমোদন পেয়েছে। উভয় পক্ষ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করে এটি কার্যকর করবে।

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ