ভারতীয়রা ২০২৫ সালে ডিজিটাল জালিয়াতিতে খুইয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার

পশ্চিম ভারতের পুনে শহরের বিজনেস অ্যানালিস্ট অলোক (ছদ্মনাম) গেল বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পিডিং ফাইন হিসেবে ১,০০০ রুপি জমা দেওয়ার জন্য একটি টেক্সট বার্তা পান।

ওই বার্তায় ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত হওয়া এড়াতে দ্রুত অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল, সে কারণে তড়িঘড়ি পেমেন্ট লিংকে ক্লিক করে বসেন তিনি। পেমেন্ট সম্পন্ন করতে তাকে একটি ওটিপি (ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড) শেয়ার করতে বলা হয়।

কয়েক মিনিট পরে তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ৩,২২৫ ডলার কেটে নেওয়া হয়, যা ছিল তার লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা।

অলোক অসাবধানতাবশত জরিমানার চেয়ে অনেক বড় অংকের অর্থ অনুমোদন করে ফেলেন। ভারতে এ ধরনের স্ক্যাম সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রতারকরা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি সাইটের ফিশিং লিংক পাঠিয়ে দেয় এবং নিশানা করা ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের জালিয়াতিকে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলে থাকেন, যেখানে প্রতারকরা মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির মাধ্যমে এবং ভয় ও জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ভুক্তভোগীদের প্রতারিত করে।

গত অর্ধ দশকে ডিজিটাল পেমেন্টের অভূতপূর্ব প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতে এই ধরনের জালিয়াতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৫ সালে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন, যা ২০২১ সালের তুলনায় ৪,৩০০ শতাংশ বেশি। প্রতারণার এই উল্লম্ফনের কারণে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক–রিজার্ভ ব্যাংক অব ইনডিয়া (আরবিআই)।

চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত একটি আলোচনাপত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা এই সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করছে।

এর মধ্যে রয়েছে অ্যাকাউন্ট-টু-অ্যাকাউন্ট লেনদেনে প্রেরকের প্রান্তে এক ঘণ্টার ল্যাগ বা বিলম্ব এবং সমাজের দুর্বল অংশ, যেমন বয়স্ক ব্যক্তিদের বড় অংকের ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে একজন ‘বিশ্বস্ত ব্যক্তি’র মাধ্যমে যাচাই করা।

সেখানে গ্রাহক অ্যাকাউন্টে বড় অংকের জমাসীমা নির্ধারণ এবং পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে, যাতে সেগুলো যে ‘মিউল’ (অবৈধ অর্থ হস্তান্তরের জন্য ব্যবহৃত অ্যাকাউন্ট) নয়, তা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া মানুষকে ডিজিটাল পেমেন্ট অন-অফ করার এবং কার্ডের মতো লিমিট সেট করার আরও নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আরবিআই এর এই সক্রিয় অবস্থানকে স্বাগত জানালেও বলেছেন, শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগের বড় কোনো ইতিবাচক প্রভাব নাও পড়তে পারে।

যেমন প্রথম প্রস্তাব, অর্থাৎ পেমেন্ট বিলম্বিত রাখার বিষয়টি ওটিপি জালিয়াতি রোধে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু আর্থিক মূল্যের দিক থেকে এই ধরনের স্ক্যাম ‘সামগ্রিক জালিয়াতির অতি সামান্য অংশ’, বলে মনে করেন আরবিআই-এর ইনোভেশন হাবের সাবেক সিইও রাজেশ বানসাল।

তিনি বলেন, “বছর তিন-চারেক এ ধরনের প্রতারণার প্রাধান্য ছিল, কিন্তু জালিয়াতি এখন অন্য স্তরে চলে গেছে এবং অনেক বেশি পরিশীলিত হয়েছে।”

বিশেষজ্ঞরো মনে করছেন, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করাও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

জালিয়াতি শনাক্তকারী বা রেগুলেটরি টেকনোলজি কোম্পানি আইডিফাই-এর ঋজু রয় বলেন, “ল্যাগ বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না, কারণ পেমেন্ট নেটওয়ার্কে অনেক পক্ষ রয়েছে। বর্তমান কাঠামোকে পরিবর্তন না করে এটি করার সহজ পথ নেই।”

আরবিআই আলোচনাপত্রে স্বীকার করেছে, লেনদেন ল্যাগ বাস্তবায়ন করতে পুরো ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে; ট্রানজ্যাকশন কিয়িং থেকে শুরু করে ক্যানসেলেশন মেকানিজম পর্যন্ত। এই ইকোসিস্টেমের জন্য খরচ ও শ্রমের ব্যাপার রয়েছে।

আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটাও স্বীকার করেছে, ডিজিটাল পেমেন্টে যে তাৎক্ষণিকতার মূল নীতি রয়েছে, তার সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা সাংঘর্ষিক।

বানসাল বলেন, “এটি এমন এক এক্সপ্রেসওয়ে অবকাঠামোর মতো, যার কয়েক কিলোমিটার পরপর স্পিড ব্রেকার রয়েছে।”

এই পদ্ধতি তেমন সহায়ক হবে না বলেই মনে করছেন ঋজু রায়।

তিনি বলেন, “প্রতারকরা তখন ল্যাগ কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজবে। যেমন তারা একজন গ্রাহককে পেমেন্টের জন্য এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলতে পারে, যাতে অ্যালার্ম না বেজে ওঠে।”

তিনি মনে করেন, প্রস্তাবিত কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে, তবে তাতে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠতে পারে।

ঋজু রায় বলেন, “বয়স্ক লোকজনের ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাইকরণ পদ্ধতি বেশ ভালো শোনায়, কিন্তু তা বাস্তবায়ন হবে কীভাবে? যদি কথিত ‘বিশ্বস্ত উপদেষ্টা’ দেশের বাইরে থাকেন? আর যদি তারা আপনাকে এমন একটি লেনদেন করতে বলে যা শেষ পর্যন্ত জালিয়াতি হিসেবে প্রমাণিত হয়? তখন দায়বদ্ধতা কার ওপর বর্তাবে?”

ক্রেডিট সীমিত করে এবং যথাযথ তদারকির মাধ্যমে মিউল অ্যাকাউন্ট শনাক্তের বিদ্যমান ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে প্রস্তাবটি কার্যকর হতে পারে। তবে তা বাস্তবায়ন করা বেশ ব্যয়বহুল এবং তা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের পকেট কাটবে বলে মনে করেন তিনি।

বানসাল বলেন, আরবিআইয়ের ইতোমধ্যে মিউল শনাক্তকরণ প্লাটফর্ম মিউলহান্টার ডট এআই তৈরি রয়েছে, যা প্রাপক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে তথ্য দেবে।

তিনি বলেন, “আমি যখন সিইও ছিলাম, তখন এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এটি রিয়েল-টাইমে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত তা ঘটেনি।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও নিয়মকানুন চালু করা সংকট সমাধানের একটি অংশ হতে পারে। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।

বিবিসি লিখেছে, ভারতীয়রা যে হারে ডিজিটাল হচ্ছে, সুরক্ষা ব্যবস্থা বা সাক্ষরতা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক অমিতাভ বচ্চনের মতো সুপারস্টারদের যুক্ত করে এবং উচ্চ-দর্শকসংখ্যার আইপিএল ক্রিকেট ম্যাচে জনসচেতনতার প্রচার চালাচ্ছে।

তবে ঋজু রায় মনে করেন, ডিজিটাল সাক্ষরতার জন্য আরও বিনিয়োগ দরকার।

বানসাল বলেন, সংকটের গভীরে হাত দিতে আরবিআইকে অবশ্যই পুলিশ, মন্ত্রণালয়, বাজার নিয়ন্ত্রক ও অন্যদের সঙ্গে আরো নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।

“এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই দায় আসলে কার?”

ঋজু রায় বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে একটি পরামর্শমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান সমস্যাটিকে আমলে নিয়েছে, সেটা সাধুবাদ পেতে পারে।

“এই আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত প্রবিধান বা নিয়মে পরিণত হবে। আরবিআই আগে যেখানে কেবল নির্দেশনা দিত, সেই তুলনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন।”

নিউজটি শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

Facebook
Twitter
WhatsApp
LinkedIn
Print

এ বিভাগের আরো খবর

ফেসবুক পেজে লাইক দিন

বিভাগীয় সংবাদ